কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬ এ ০১:০৯ PM
কন্টেন্ট: পাতা
ক্রীড়া বিভাগ — কাবাডি | |||||||
উচ্চ-তীব্রতাসম্পন্ন, অ্যাকশনে ভরপুর এক খেলা — কাবাডি। দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে উদ্ভূত এই খেলাটি শারীরিক দক্ষতা, কৌশল ও দলগত মননশীলতার অনন্য মিশ্রণের কারণে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। খেলাটির উদ্দেশ্য সহজ – একজন রেইডার প্রতিপক্ষের কোর্টে প্রবেশ করে, যত বেশি সম্ভব খেলোয়াড়কে স্পর্শ করতে হয়, এবং ধরা পড়ার আগে নিজেদের কোর্টে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু এর সরলতায় বিভ্রান্ত হবেন না – কাবাডি একটি উত্তেজনাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং খেলা যার জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ-গতির প্রতিক্রিয়া, মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও নিখুঁত দলগত সমন্বয়। কয়েক হাজার বছরের শিকড়বিশিষ্ট এই দেশীয় খেলা ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পায়, এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে আজ এটিকে জাতীয় খেলার মর্যাদায় তুলে ধরেছে। এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-র কাবাডি বিভাগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাছাই করা মেধাবী খেলোয়াড়দের আধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, যোগ্য কোচ ও প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করা হয়, যার লক্ষ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার মতো দক্ষ খেলোয়াড় গড়ে তোলা। | |||||||
কাবাডি কি? খেলার পরিচিতি | |||||||
কাবাডি একটি প্রাচীন যুদ্ধমূলক দলগত খেলা যা দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক ও মার্শাল ঐতিহ্যের গভীরে শিকড়বদ্ধ, যার উৎপত্তি ৪,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো বলে বিশ্বাস করা হয়। সবচেয়ে স্বীকৃত মতবাদ অনুযায়ী 'কাবাডি' নামটি তামিল ভাষার 'কাইপ্পিডি' (হাত ধরা) শব্দ থেকে এসেছে, এবং বাংলাদেশে এটি 'হা-ডু-ডু' নামে পরিচিত — তামিলনাড়ুতে 'সাদুগুডু', পাঞ্জাবে 'কউড়ি-কউড়ি', ইরানে 'জু' নামে এর আঞ্চলিক রূপ আছে। খেলায় দুটি দল আয়তাকার মাঠে মুখোমুখি হয়, প্রতি দলে ৭ জন মাঠে থাকেন এবং একজন রেইডার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে 'কাবাডি কাবাডি' উচ্চারণ করতে করতে প্রতিপক্ষের এলাকায় প্রবেশ করে যত বেশি সম্ভব খেলোয়াড়কে স্পর্শ করে নিরাপদে ফিরে আসার চেষ্টা করেন, যেখানে স্পর্শ করা খেলোয়াড়ের সংখ্যাই পয়েন্ট নির্ধারণ করে এবং পুরো প্রতিপক্ষকে আউট করলে 'লোনা' ঘোষিত হয়। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ এই হা-ডু-ডুকেই জাতীয় খেলার মর্যাদা দিয়ে এটিকে দেশের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত করে। | |||||||
| |||||||
"মাটির কোর্টে ঐতিহ্য: আধুনিক ম্যাট পূর্ববর্তী কাবাডি" | |||||||
অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি | |||||||
কাবাডির জন্মস্থান নিয়ে একটি দীর্ঘ বিতর্ক থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ঐতিহাসিক ও ভাষাতত্ত্ববিদরা এর উৎপত্তি ভারতের তামিলনাড়ুতে বলে মনে করেন। এরপর ১৯২১ সালে মহারাষ্ট্রে সাঞ্জীবনী ও জেমিনি রীতির সমন্বয়ে কাবাডির প্রথম পরিচিত নিয়মকাঠামো তৈরি করা হয়, এবং ১৯২৩ সালে একটি কমিটি সেই নিয়মগুলো সংশোধন ও লিখিত আকারে প্রকাশ করে, যা একই বছর বরোদায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া কাবাডি টুর্নামেন্টে প্রয়োগ করা হয়। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে কাবাডি প্রথম আন্তর্জাতিক মঞ্চে আসে, এবং পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা পায়, যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বাংলাদেশও। ১৯৮০ সালে এশিয়ান কাবাডি ফেডারেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় ১ম এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ, যেখানে ভারত চ্যাম্পিয়ন ও বাংলাদেশ রানার্স-আপ হয়। ২০০৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল কাবাডি ফেডারেশন (IKF) প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং একই বছর মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম কাবাডি বিশ্বকাপ, যেখানে ফাইনালে ইরানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। বর্তমানে আধুনিক কাবাডির চারটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক রূপ রয়েছে — স্ট্যান্ডার্ড স্টাইল, যা ১৯৮২ সালে নয়াদিল্লি এশিয়ান গেমসে প্রথমবার প্রদর্শনী ইভেন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৯০ সালে বেইজিং এশিয়ান গেমসে নিয়মিত পদকজয়ী ইভেন্ট হিসেবে স্থান পায়; সার্কেল স্টাইল, পাঞ্জাব-পাকিস্তানে জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী রূপ, যার নিজস্ব বিশ্বকাপ শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে পাঞ্জাব সরকারের আয়োজনে; বিচ কাবাডি, যা ২০০৮ সালে বালিতে অনুষ্ঠিত ১ম এশিয়ান বিচ গেমসে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়; এবং ইনডোর কাবাডি, যা ২০০৭ সালে ম্যাকাওয়ে অনুষ্ঠিত ২য় এশিয়ান ইনডোর ও মার্শাল আর্টস গেমসে প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়। অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্তির জন্য IOC-র শর্ত পূরণে International Kabaddi Federation (IKF) ২০৩২ ও ২০৩৬ অলিম্পিককে লক্ষ্য রেখে কাজ করছে। | |||||||
| |||||||
স্ট্যান্ডার্ড কাবাডি কোর্টের পরিমাপ ও লেআউট (পুরুষ / জুনিয়র বালক) | |||||||
বাংলাদেশ কাবাডি | |||||||
বাংলাদেশে 'হাডুডু' নামে পরিচিত কাবাডি বাংলার কৃষিজীবী সমাজের শত বছরের ঐতিহ্য, যা ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর জাতীয় খেলা হিসেবে ঘোষিত হয় — কারণ এটি বিনাসরঞ্জামে খেলা যেত এবং ঈদ-পূজার মতো গ্রামীণ উৎসবে বাংলার কৃষিজীবী সমাজের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। ১৯৭৩ সালে Bangladesh Kabaddi Federation (BKF) গঠিত হয় এবং ১৯৭৪ সালে ভারতীয় কাবাডি দলের বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়, যার ফলস্বরূপ ১৯৯০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এশিয়ান গেমসে টানা পাঁচটি পদক (৩ রৌপ্য, ২ ব্রোঞ্জ) এবং দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে মোট ১০টি পদক অর্জিত হয়। ২০২৫ সালে ৫১ বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে নেপালের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক টেস্ট সিরিজ ফিরে আসে, যেখানে পুরুষ দল ৪-১ ব্যবধানে জয়ী হয় এবং নারী দল কাঠমান্ডুতে ঐতিহাসিক প্রথম নারী টেস্ট সিরিজ খেলে। একই বছর অক্টোবরে বাহরাইনে অনুষ্ঠিত ৩য় এশিয়ান যুব গেমসে কাবাডিতে বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাবাডি দল বালক ও বালিকা উভয় বিভাগেই ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে, যা এই আসরে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম পদক। এই বছরেরই সবচেয়ে বড় অর্জন আসে নভেম্বরে, যখন ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ২য় IKF নারী কাবাডি বিশ্বকাপ আয়োজনের পাশাপাশি বাংলাদেশ নারী দল নিজেরাই ব্রোঞ্জ পদক জয় করে — যা ভারতের বাইরে অনুষ্ঠিত প্রথম কাবাডি বিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের কাবাডি ইতিহাসের একটি মাইলফলক। | |||||||
| |||||||
”৩য় এশিয়ান যুব গেমস ২০২৫-এ ব্রোঞ্জ পদক বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাবাডি দল” | |||||||
বিকেএসপিতে কাবাডি বিভাগ | |||||||
৪.১ প্রতিষ্ঠা ও বর্তমান অবস্থাকাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। ২০২০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ১৪ জন প্রশিক্ষণার্থী ও ০১ জন প্রশিক্ষক নিয়ে বিকেএসপিতে কাবাডি বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এই ক্রীড়া বিভাগটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বরিশালে চলমান রয়েছে। বর্তমানে কাবাডি বিভাগে ৪০ জন প্রশিক্ষণার্থী ও ১ জন কোচ (রাজস্ব) এবং ১ জন শারীরিক শিক্ষক (সংযুক্ত কাবাডি কোচ) রয়েছেন। প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য এই ক্রীড়া বিভাগে ০২ (দুই) টি কাবাডি ম্যাট রয়েছে। কাবাডি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন খান মোঃ ইমতিয়াজ। | |||||||
”বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এর কাবাডি বিভাগের প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীবৃন্দ” | খান মোঃ ইমতিয়াজবিভাগীয় প্রধান (কাবাডি বিভাগ) | ||||||
৪.২ বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাবাডি দলের হয়ে বিকেএসপির ক্যাডেটদের আন্তর্জাতিক সাফল্য২০২৩ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত ২য় যুব বিশ্বকাপ কাবাডি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাবাডি দলের হয়ে বিকেএসপি কাবাডি বিভাগের ৩ জন ক্যাডেট — শেখ তসলিম উদ্দিন (কাবা-০২), আবু রায়হান (কাবা-১০) ও জুয়েল ইসলাম (কাবা-১৬) — অংশগ্রহণ করেছেন। ২০২৫ সালের ১৯-২৩ অক্টোবর বাহরাইনের মানামায় অনুষ্ঠিত ৩য় যুব এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাবাডি দল ব্রোঞ্জ পদক জয় করে, এবং সেই দলে বিকেএসপি কাবাডি বিভাগের ৯ জন ক্যাডেট অংশগ্রহণ করেছেন:
| |||||||
“৩য় এশিয়ান যুব গেমসে বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাবাডি দলের হয়ে অংশগ্রহণকারী বিকেএসপির ৯ জন কৃতি ক্যাডেট” | |||||||
“৩য় এশিয়ান যুব গেমসে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে রেইডরত বিকেএসপি কাবাডি বিভাগের ক্যাডেট জুলফিকার আকাশ (কাবা-৩১)” | “৩য় এশিয়ান যুব গেমসে বাংলাদেশ বনাম থাইল্যান্ড ম্যাচের একটি রোমাঞ্চকর মুহূর্ত” | ||||||
৪.৩ জাতীয় প্রতিযোগিতায় বিকেএসপি কাবাডি বিভাগের সাফল্য | |||||||
প্রতিযোগিতা | ভেন্যু | তারিখ | অর্জন | ||||
বন্দর স্টীল ২য় বিভাগ কাবাডি লীগ ২০২৩ | কাবাডি স্টেডিয়াম, ঢাকা। | ২২-৩১ অক্টোবর ২০২৩ ইং | রানারআপ, ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ | ||||
তারুণ্যের উৎসব ২০২৫ যুব কাবাডি অনূর্ধ্ব-১৮ | পল্টন আউটার স্টেডিয়াম, ঢাকা। | ১৩-১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ইং | চ্যাম্পিয়ন | ||||
জাতীয় কাবাডি ২০২৫-এর চূড়ান্ত পর্বে মোঃ জুলফিকার আকাশ (কাবা-৩১) সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন — যা ব্যক্তিগত পুরস্কার বিভাগে বিকেএসপি কাবাডির প্রথম স্বীকৃতিগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিকেএসপি কাবাডি বিভাগের এই ধারাবাহিক অগ্রগতি থেকে বোঝা যায় যে বিকেএসপি কাবাডি বিভাগ জাতীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। | |||||||
|
| ||||||
”তারুণ্যের উৎসব ২০২৫ (অনূর্ধ্ব-১৮ যুব কাবাডি)-এ চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কারসহ বিকেএসপি কাবাডি দল” | ”বন্দর স্টিল ২য় বিভাগ কাবাডি লীগ ২০২৩-এ রানার্স-আপ ট্রফি গ্রহণ করছে বিকেএসপি কাবাডি দল” | ||||||
| |||||||
'তারুণ্যের উৎসব ২০২৫' যুব কাবাডিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর বিকেএসপির পতাকা হাতে ক্যাডেটদের বিজয় উল্লাস! | |||||||